আবদুর রাজ্জাক, যিনি নায়করাজ রাজ্জাক নামে পরিচিত, একসময় সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতেন। টেলিভিশনে অভিনয় করে তিনি সপ্তাহে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা পেতেন। মাসের খরচ ছিল প্রায় ৬০০ টাকা। সন্তানদের দুধ জোগাড় করতেই সামান্য আয় শেষ হয়ে যেত। কখনো স্ত্রীকে নিয়ে উপোসও করতে হয়েছে। টাকার অভাবে ফার্মগেট থেকে ডিআইটি টেলিভিশন কেন্দ্রে হেঁটে যেতেন। সেই মানুষটিই পরে হয়ে উঠলেন ঢালিউডের মহানায়ক।
রাজ্জাকের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার টালিগঞ্জে। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ছোটবেলায় ইচ্ছা ছিল খেলোয়াড় হওয়ার। কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলের স্পোর্টস শিক্ষক তাঁকে এক মঞ্চনাটকে কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য বেছে নেন। সেখান থেকে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এসএসসি পাস করার পর তিনি অভিনয় শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে টেলিভিশন নাটকে সুযোগ পান। কলকাতায় অভিনয় করতে গিয়ে উত্তমকুমারের সঙ্গে দেখা হয়। তপন সিনহা ও পরিচালক পীযূষ বোসের সান্নিধ্যেও আসেন। পীযূষ বোসের পরামর্শেই পরে ঢাকায় আসেন।
কলেজে পড়ার সময় ১৯৫৮ সালে চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ আসে অজিত ব্যানার্জির ‘রতন লাল বাঙালি’ ছবিতে পকেটমারের চরিত্রে। এরপর ‘শিলালিপি’ ছবিতে একটি গানের দৃশ্যে অতিরিক্ত শিল্পী হিসেবে অংশ নেন এবং ২০ টাকা সম্মানী পান। নায়ক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৫৯ সালে মুম্বাইয়ে যান এবং ফিল্মালয়ে ভর্তি হন। সেখানে দিলীপ কুমারসহ অন্যরা ক্লাস নিতেন। তবে চঞ্চলতার কারণে এক বছরের কোর্স শেষ করতে পারেননি এবং মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতে জায়গা করে নিতে পারেননি।
১৯৬২ সালে কলকাতার বাঁশদ্রোণী এলাকায় খায়রুন্নেসার সঙ্গে দেখা হয়। পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় এবং শীঘ্রই প্রথম সন্তান বাপ্পারাজের জন্ম হয়। ১৯৬৪ সালের ২৬ এপ্রিল স্ত্রী ও আট মাস বয়সী পুত্রকে নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান। প্রথমে কমলাপুরের একটি বাসায় ওঠেন, মাসিক ভাড়া ছিল ৮০ টাকা। পরিচিতজন না থাকায় একসময় পরিবার নিয়ে স্টেডিয়াম এলাকার একটি ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসতে হয়েছে। সেই স্মৃতি পরে রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের লোগোতে তুলে ধরা হয়, যা সুভাষ দত্ত তাঁর পরিকল্পনামতো নকশা করেন।
ঢাকায় তাঁর ঠিকানা বদলেছে একাধিকবার—কমলাপুর থেকে দিলু রোড, ফার্মগেট এবং পরে গুলশান-২ নম্বর রোডের লক্ষ্মীকুঞ্জ। ঢাকার চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় ১৯৬৫ সালের ‘আখেরি স্টেশন’ ছবিতে সহকারী স্টেশনমাস্টারের চরিত্রে। এরপর ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবিতে নায়ক হিসেবে সুযোগ পান এবং সাইনিং মানি হিসেবে ৫০০ টাকা নগদ পান। ছবিটি সফল হয় এবং তিনি নতুন নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। পরবর্তীতে একের পর এক সফল ছবিতে অভিনয় করে ‘নায়করাজ’ উপাধি লাভ করেন।
রাজ্জাক ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট মারা যান। লক্ষ্মীকুঞ্জে তাঁর শোবার ঘরটি আগের মতোই সাজানো আছে, কাপড়চোপড় ও পারফিউমসহ অন্যান্য জিনিস রাখা হয়েছে। মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবার মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে এবং আশপাশের এতিমখানার শিশুদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করে। সন্ধ্যায় কোরআন খতমের পরিকল্পনাও ছিল। মেজ ছেলে বাপ্পী কানাডায় ছিলেন, অন্য সদস্যরা মায়ের সঙ্গে লক্ষ্মীকুঞ্জে ছিলেন। রাজ্জাক বনানীর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত আছেন।
Reviewed by Admin
on
August 21, 2026
Rating:



