ভোকেশনাল শাখার নথিপত্র পুড়িয়ে দিতেই কলসিন্দুর স্কুলের অফিসে আগুন

0
240


ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
বাংলাদেশ অনুর্ধ-১৯ নারী ফুটবলের আঁতুরঘর হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের স্কুল শাখার অফিস কক্ষে দুর্বৃত্তের দেয়া আগুনের ঘটনার কূলকিনারা হয়নি দীর্ঘ দিনেও। প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি প্রশাসন কিংবা ঘটিত তদন্ত কমিটি। স্কুলের দায়িত্বশীলদের কথাবার্তায় রয়েছে অসংলগ্নতা। ভোকেশনাল শাখার অফিসের রাখা গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নষ্ট করা ও কিছু প্রামনপত্র সরিয়ে ফেলাই এ অগ্নিকান্ডে মূল কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে স্থানীয় অনেকের ধারণা।
গত ১৪ মে দুর্বৃত্তের লাগানো ঐ আগুনে ফুটবলকন্যাদের খেলাধূলার সনদপত্র ও মেডেল, রেজ্যুলেশন বইসহ স্কুলের ভোকেশনাল শাখার হিসাব-নিকাশের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়ে যায়। এছাড়া একটি পেনড্রাইভ ও একটি রেজ্যুলেশন খাতা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
সুত্র জানায়, কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের ভোকেশনাল শাখায় নবম শ্রেণীতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭৮জন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভর্তি ফি বাবদ ২৫শ থেকে ৩হাজার টাকা নেয়া হয়। দশম শ্রেণীতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬৩জন। দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বোর্ড ফি অনুযায়ী টাকা নেয়া হয়।
কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রতন মিয়া বলেন, পরীক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র দেয়ার নাম করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নেয়া এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির দায়ে স্কুলের ভোকেশনাল শাখার শিক্ষক সোহাগ মিয়াকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এরপর থেকে সোহাগ মিয়া পলাতক রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য সোহাগ মিয়ার স্ত্রীকে চাপ দিলে তিনি অধ্যক্ষ রতন মিয়া ও আবু নাঈম রিপনকে আসামী করে ধোবাউড়া থানায় একটি অপহরণের অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে অধ্যক্ষ রতন মিয়া বলেন, অভিযোগটি এখন কোন পর্যায়ে আছে আমার জানা নেই।
কলসিন্দুর স্কুলের ভোকেশনাল শাখার দায়িত্ব কার কাছে ছিল জানতে চাইলে অধ্যক্ষ রতন মিয়া বলেন, সাবেক অধ্যক্ষ জালাল মিয়া ভোকেশনাল শাখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন স্কুল শাখার সহকারী শিক্ষক (বিজ্ঞান) আবু নাঈম রিপনের কাছে। তবে আগুন লাগার ঘটনার পর থেকে আবু নাঈম রিপন দায়িত্ব থেকে সরে দাড়ান।
ভোকেশনাল শাখায় কতজন শির্ক্ষাথী আছে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ রতন মিয়া বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। ভোকেশনাল শাখায় ভর্তি ফি কত তাও তিনি জানাতে পারেনি। স্কুলের অফিস কক্ষে আগুন লাগায় ভোকেশনাল শাখার হিসাব-নিকাশের কিছু কাগজপত্র পুড়ে গেছে ও একটি পেনড্রাইভ নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।
অধ্যক্ষ রতন মিয়া অভিযোগ করে বলেন, বিদ্যালয়ের সরকারীকরণের কাজে বাধা সৃষ্টি করার জন্যই কেউ এমন কাজ করেছে। তবে, যে বা যারাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে স্কুল শাখার সহকারী শিক্ষক (বিজ্ঞান) আবু নাঈম রিপনের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভোকেশনাল শাখার দায়িত্ব কখনোই আমার কাছে ছিল না। কিভাবে আগুন লেগেছে তাও আমার জানা নেই বলে তিনি লাইন কেটে দেন। তারপর আবারও তাকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে অধ্যক্ষ রতন সাহেব ভাল বলতে পারবেন বলে আবারও লাইন কেটে দেন তিনি।
এ বিষয়ে কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের সহকারী হিসাব রক্ষক সারোয়ার হোসেন একদিল‘র ফোনে একাধিক বার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করনেনি।
কলসিন্দুর কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও কলসিন্দুর নারী ফুটবল দলের ম্যানেজার মালারানী সরকার বলেন, যারা এ নেক্কারজনক ঘটনাটি ঘটিয়েছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এর বিচার চাই। যাতে কেউ এমন ঘটনা আর ঘটাতে না পারে।
গামারীতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খান বলেন, কলসিন্দুল স্কুল এন্ড কলেজের স্কুল শাখার অফিস কক্ষে আগুন লাগার ঘটনাটি খুবই ন্যাক্কারজনক। যে বা যারাই এ ঘটনার সাথে জড়িত। সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের বিচারের আওয়তায় আনা হোক।
ধোবাউড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিউল আলম বলেন, আমাদের তদন্ত পতিবেদন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জমা দেয়া হয়েছে। তবে, এর চাইতে বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।
এ বিষয়ে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক একটা তদন্ত হাতে পেয়েছি। তাতে সু-নির্দিষ্ট কাউকে দায়ী করা হয়নি।
তবে, ধোবাউড়া উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শফিউল আলমকে প্রধান করে দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটি করে সাত দিনের মধ্যে যে প্রতিবেদন দেয়ার কথা ছিল। তার জন্য আরো সময় লাগবে বলে জানান তিনি।
এ ব্যাপারে ধোবাউড়া থানার ওসি আলী আহাম্মদ মোল্লা জানান, কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের স্কুল শাখায় আগুন লাগার ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে।
রবিবার (২৮ জুলাই) বিকালে কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ রতন মিয়া ও স্থানীয় চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন খান’কে নিয়ে আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, তাদের সাথে কি আলোচনা হয়েছে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে তা গোপন রাখা হয়েছে।
স্কুল শাখায় আগুন লাগার ঘটনায় কি কি আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৩ হাজার পুড়া টাকাসহ অন্যান্য কাগজপত্র জব্দ করা হয়েছে।
তবে পুড়া ৩ হাজার টাকা জব্দ করার বিষয়টি অধ্যক্ষ রতন মিয়া অস্বীকার করেছে বলে জানালে তিনি বলেন, পুড়া টাকা জব্দ করা হয়েছে। অধ্যক্ষ রতন সাহেব কেন অস্বীকার করেছেন। তা আমার জানা নেই বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা শাখার ওসি শাহ কামাল আকন্দ বলেন, কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের তদন্তের বিষয়টি আমাদের কাছে নেই। তবে, কলসিন্দুর স্কুল এন্ড কলেজের পিয়ন করম আলী ও চান মিয়াকে প্রাথমিক ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তাদের এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ১৪ মে মঙ্গলবার রাতে কলসিন্দুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে এ আগুন দেয় দুবৃত্তরা। বিদ্যালয়ের আগুন দেয়ার ঘঠনায় মেয়েদের খেলার সনদপত্র, রেজুলেশন বই, কারিগরি শাখার কাগজপত্রসহ প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়ে যাই। এ ছাড়া সেখান থেকে একটি পেনড্রাইভ নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
পরে ভোররাতে শিক্ষক উজ্জল বিশেষ ক্লাসের জন্য স্কুলে গিয়ে দেখেন অফিসকক্ষে আগুন জ্বলছে। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকরাও উপস্থিত হন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here